আরো সংকুচিত আর্থিক অন্তর্ভুক্তি

পল্লী ঋণ বিতরণ কমেছে ২৪ শতাংশ

গত কয়েক বছরে উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসসহ (এমএফএস) ডিজিটাল নানা মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে।

গত কয়েক বছরে উপশাখা, এজেন্ট ব্যাংকিং, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসসহ (এমএফএস) ডিজিটাল নানা মাধ্যমে দেশের গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাংকের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হয়েছে। এসবের লক্ষ্য ছিল গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আনা। যদিও এসব নেটওয়ার্ক এখনো জনগণের কাছ থেকে আমানত সংগ্রহ ছাড়া আর কোনো ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো গ্রামাঞ্চলে আগে যে পরিমাণ ঋণ পৌঁছত সেটিও হ্রাস পেয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) ব্যাংকগুলোর পল্লী ঋণ (নন-ফার্ম রুরাল ক্রেডিট) ঋণ বিতরণ প্রায় ২৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। একই সময়ে ঋণ আদায় কমেছে ২ দশমিক ২২ শতাংশ। ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে পল্লী অঞ্চলে ৪ হাজার ৩৩০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হলেও গত অর্থবছরের একই সময়ে সেটি ৩ হাজার ৩১০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।

ব্যাংক কর্মকর্তারা বলছেন, তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকের তহবিল সংগ্রহের ব্যয় বেড়েছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো পল্লী ঋণের পাশাপাশি কৃষি ঋণের প্রতিও গুরুত্ব কমিয়েছে। তাই অর্থবছরের শুরুতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দিলেও এ খাতে ঋণ বিতরণ বাড়েনি।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, প্রায় চার বছর ধরে দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। মূল্যস্ফীতি বাড়লে গ্রামীণ অঞ্চল তথা নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মানুষই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্থবিরতা নেমে আসে। এ অবস্থায় পল্লী ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার অর্থ হলো গ্রামীণ অর্থনীতি সংকোচনের মুখে পড়েছে। এতে কুটির, ক্ষুদ্র, ছোট ও মাঝারি (সিএমএসএমই) উদ্যোগগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় একটি অংশ হয়েছে প্রান্তিক অঞ্চলে। ঐতিহ্যগতভাবে কৃষি এ অর্থনীতির ভিত্তি হলেও গ্রামীণ জনেগোষ্ঠীর জীবিকা বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে প্রান্তিক নারী ও পুরুষেরা জড়িত হচ্ছেন ক্ষুদ্র ব্যবসা, হস্তশিল্প, হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশু পালন, দোকান কিংবা ঘরভিত্তিক খাদ্য প্রস্তুত উদ্যোগে। এসব ক্ষুদ্র উদ্যোগ স্থানীয় পর্যায়ে আয় ও কর্মসংস্থান তৈরিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

এ বাস্তবতায় বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর নির্দেশনা দিয়ে আসছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) নন-ফার্ম রুরাল ক্রেডিট খাতে ঋণ বিতরণ আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় কমেছে ১ হাজার ১৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। এ প্রবণতা শুধু প্রান্তিক ব্যবসা নয়, সার্বিক গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে বলে মনে করা হচ্ছে।

বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঋণ বিতরণ কমে যাওয়ার অর্থ যারা ছোটখাটো ব্যবসা করছেন, তারা ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে পারছেন না। অনেকে বাধ্য হচ্ছেন ব্যবসা বন্ধ করে দিতে। এতে একদিকে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির অগ্রগতি কমে যাচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও আয়েও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে।’

অর্থনীতির আকার না বাড়লে ব্যক্তিপর্যায়ের আয়ও বাড়বে না বলে মনে করেন এ অর্থনীতিবিদ। তিনি বলেন, ‘কৃষি খাতে যারা কাজ করেন তারা সারা বছর সেখানে নিয়োজিত থাকেন না। ফলে বিকল্প কর্মসংস্থান ও আয় তৈরিতে অকৃষি খাতের বিকাশও খুব জরুরি। গ্রামীণ অকৃষি খাতকে প্রাণচঞ্চল রাখতে এখনই সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। এমনিতেই সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতি কমে যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি সামান্য কমলেও এখনো তা সহনীয় নয়; বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য।’

বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গত অর্থবছরে কৃষি ও পল্লী খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সরকারি-বেসরকারি বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোকে সম্মিলিতভাবে এ ঋণ বিতরণের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রথম ১০ মাসে সবগুলো ব্যাংক মিলে ঋণ বিতরণ করেছে মাত্র ২৯ হাজার কোটি টাকা। অর্থবছরের শেষ দুই মাসের তথ্য এখনো সামনে আসেনি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ দুই মাসে লক্ষ্যমাত্রার বাকি ৯ হাজার কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা সম্ভব হয়নি।

পল্লী ঋণ বিতরণে ভাটার প্রভাব পড়েছে কর্মসংস্থানেও। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ (১৮ মে প্রকাশিত) অনুযায়ী, ২০২৪ সাল শেষে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ২০ হাজারে, যা ২০২৩ সালের ২৪ লাখ ৬০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬০ হাজার বেশি।

গ্রামীণ উৎপাদন খাত, বিশেষ করে কৃষিকে উৎসাহিত করতে বহুদিন ধরেই এ খাতে ঋণের সুদহার সীমিত রাখা হয়েছিল। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশ নির্ধারিত থাকলেও কৃষি খাতে তা ছিল সর্বোচ্চ ৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪ সালের মে মাস থেকে সব ধরনের ঋণের সুদহার বাজারভিত্তিক করে দেয়া হয়। এতে কৃষি ও প্রান্তিক খাতের ঋণের সুদও বেড়ে যায়।

একদিকে সুদহার বৃদ্ধি, অন্যদিকে প্রান্তিক পর্যায়ে ঋণ বিতরণ ও আদায়ে অতিরিক্ত পরিচালন খরচ—এই দুই কারণে পল্লী অঞ্চলে ঋণ বিতরণের প্রবণতা হ্রাস পেয়েছে বলে জানিয়েছেন ব্যাংক নির্বাহীরা।

এ প্রসঙ্গে পূবালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সামগ্রিকভাবে পুরো বেসরকারি খাতেই ঋণ প্রবৃদ্ধি কম। এর কিছু প্রভাব কৃষি ও পল্লী ঋণেও পড়বে এটিই স্বাভাবিক। বেসরকারি খাতকে প্রাণবন্ত করতে হলে রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে হবে। স্থিতিশীলতা ফিরলে তবেই গ্রামীণ অর্থনীতির পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিও প্রাণবন্ত হবে।’

আরও